‘পুলিশের সহানুভূতি পেতে শিশু ও পরিবারকে ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা‘
রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ব্যবসায়ীরা দিন দিন কৌশল পাল্টিয়ে নতুন রূপ ধারন করছে। মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করার পর সাধারন মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহানুভূতি পেতে নতুন কৌশল হিসেবে নিজের শিশু সন্তান ও পরিবারের অসুস্থ বৃদ্ধ কিংবা স্ত্রীকে ব্যবহার করছেন। মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের পর এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পরেছে। যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও তে দেখা যায়, এক শিশু তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। এ সময় বাবাকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ধরে রেখেছেন। এর মধ্যে একজন এসে ওই ব্যক্তির গালে চড় বসিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, আর মাদক আছে কিনা? বাবাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর কান্নার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বেশ সমালোচনার জন্ম দেয়। যা নিয়ে ফেইসবুকে সরব হয়েছেন ব্যবহারকারীরা। এ ঘটনায় আটক করে রাখা ব্যক্তির নাম রুস্তম কসাই। তিনি জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা ও মাদক বিক্রেতা। তার বাবার নাম জানে আলম কাল্লু।
এ ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় জেনেভা ক্যাম্পের ভেতর মূল সড়কে ময়লার ভাগাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে মাদক (ইয়াবা) বিক্রী করছিলো রুস্তম কসাই। সে সময় জেনেভা ক্যাম্পের ভেতর পুলিশের অভিযানে তাকে আটক করা হয়। তখন তার পকেটে থাকা প্রায় ৫০ এর অধিক ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। তবে তাকে আটকের সাথে সাথে তার ৮ বছরের শিশু সন্তানকে কাছে ডেকে নিয়ে আসে সে। শিশুটির বাবাকে পুলিশ ধরে রেখেছে দেখে শিশুটি কান্না করতে থাকে। ততক্ষনে পুলিশ তার থেকে মাদক জব্দের চেষ্টা করছিলো। ওই সময় রুস্তম কসাই কে পাশ থেকে একজন চড় মেরে তার কাছে লুকিয়ে রাখা আরও ইয়াবা গুলো বের করতে বলছে। এ বিষয়টি দেখে শিশুটি তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে আরও কান্না করা শুরু করে। এরপর পাশ থেকে একজন এসে শিশুটিকে নিয়ে যায়। রুস্তম কসাই ওই সময় পুলিশকে বলছিলেন, তিনি ইয়াবা বিক্রীর পাশাপাশি প্রতিদিন ৪ টা করে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করতে হয়।
তবে,এই ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, রুস্তম কসাই জেনেভা ক্যাম্পের একজন খূচরা মাদক ব্যবসায়ী। সে পাইকারী মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে মূল সড়কের ময়লার ভাগারের সামনে দাঁড়িয়েই মাদক বিক্রী করে। এছাড়াও, রুস্তম কসাই গতো কয়েক বছরে মোহাম্মদপুর,মিরপুর,শেরে বাংলা নগর থানা সহ রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় মাদক বিক্রী করতে গিয়ে পুলিশের হাতে মাদকসহ বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় প্রায় ১৭ এর অধিক মামলা রয়েছে। যেসব মামলার কপি রয়েছে ঢাকা পোষ্টের হাতে সংগ্রহ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছেন, শিশুকে সামনে নিয়ে আসা এবং পরিবারের বৃদ্ধ অসুস্থ ব্যক্তিকে সামনে নিয়ে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহানুভূতি পাওয়া তাদের একটি নয়া কৌশল মাত্র। মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের এই কৌশল অবলম্বন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে চায়।
তার আগের দিনে অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় ইসতেখার নামে আরেক ব্যক্তিকে। তিনি প্রথমে মিডিয়ায় দাবি করেন, তিনি তার শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন।তবে,তথ্য বলছে, তিনি জেনেভা ক্যাম্পের বি ব্লকের ১৬২ নম্বর বাসায় স্থায়ী বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত ওজির। তিনি শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে আসা দাবিটি একেবারে মিথ্যা।
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা ও শীর্ষ মাদক কারবারি এসকে নাসিম বলেন, ইসতেখার আগে খুচরা মাদক বিক্রী করতো। গত কয়েক বছর যাবৎ সে মাদকের পাইকারী বিক্রী শুরু করে। জেনেভা ক্যাম্পের বিভিন্ন জায়গায় মাদকের খূচরা বিক্রেতাদের এসে ইয়াবা সাপ্লাই দিয়ে যেতেন। সে গ্রেপ্তারের দিন আল ফালাহ মেডিকেলের গলিতে রুহী নামে এক নারীর কাছে মাদক সাপ্লাই দিতে এসে গ্রেপ্তার হয়েছেন। সে এর আগেও বেশ কয়েকবার পুলিশের হাতে মাকদসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের তথ্য বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া ইসতেখার এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় প্রায় ৭-৮ টির মাদক মামলা রয়েছে।
তবে, এ দুটি ঘটনায় শিশু ও বৃদ্ধ নারীকে ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহানুভূতি পেতে সরব হয়ে ওঠেছেন। তবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তারের পর পুলিশ কে বিব্রত কর নানা ধরনে মিথ্যা তথ্য দিয়েচেন তারা।
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বলেন, মাদক বিক্রেতারা নতুন কৌশল হিসেবে শিশু ও অসুস্থ বৃদ্ধ নারীদের সামনে ঠেলে দিয়ে সহানুভূতি পেতে চায়। মাদক ব্যবসায়ীরা তাদেরকে নির্দোষ সাজাতে এমন কৌশল অবলম্বন করছেন। আমরা মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে আদালতে প্রেরন করেছি। এছাড়াও,যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়া বেসে বেড়াচ্ছে ঘটেছে সেগুলো আমরা তদন্ত করছি।
তিনি আরও বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে সপ্তাহে প্রায় পাঁচ দিনে মারামারি ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। গত কয়েকদিন আগে জাহিদ নামে ককটেল বিস্ফোরণে এক যুবক মারা যায়। এরমধ্যে পুলিশ ও সেনাবাহিনী আলাদা আলাদা অভিযান করে বিপুল পরিমাণ ককটেল, ধারালো অস্ত্র, ককটেল বানানোর মূল উপাদান গান পাউডার, হেলমেট, মার্বেল ও সামুরাইসহ সংঘর্ষে ব্যবহৃত নানা ধরনের আলামত উদ্ধার করেছে। প্রতিদিন আমরা এখানে অভিযান পরিচালনা করে মাদক ব্যবসায়ের সাথে জড়িত বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে প্রেরণ করছি। আমাদের মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে বলে জানান তিনি।’
এসসি//



