শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬
Sponsored Ads
Mehedi Hasan
অপরাধমোহাম্মদপুর থানায় ‘১০ লাখ টাকার হেরোইন মামলা’ গায়েবের অভিযোগ ওসির বিরুদ্ধে

মোহাম্মদপুর থানায় ‘১০ লাখ টাকার হেরোইন মামলা’ গায়েবের অভিযোগ ওসির বিরুদ্ধে

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসানের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা মূল্যের হেরোইন উদ্ধার মামলার নথি গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার,কিন্তু মামলা ড্রাফট চালান জিডি গায়েব

গত ৬ মে রাতে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে মো. সাদ্দাম ওরফে ম্যানেজার সাদ্দাম (৩৫) নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে থানা পুলিশ। তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়—যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা। একই রাতেই (৭ মে) সাদ্দামের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করার জন্য একটি এফআইআর ড্রাফট, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং আসামি চালান কপি প্রস্তুত করা হয়।

কিন্তু পরে ঘটে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। ওই ২৪ নম্বর মাদক মামলা থানার রেকর্ড থেকে গায়েব হয়ে যায়। পরিবর্তে একই নম্বরে একটি ছিনতাই মামলা দায়ের করা হয়। সেখানে সাদ্দামকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি; বরং ২০২৪ সালের পুরোনো একটি ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে চালান দেওয়া হয়। জব্দ করা হেরোইনও আদালতে জমা দেওয়া হয়নি।” এতে প্রশ্ন উঠেছে—হেরোইন কোথায় গেল? মামলা কেন বদল হলো?

২৪ নম্বর মামলার ড্রাফট ও আসামি চালানের কপি সংযুক্ত।

অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেল

অনুসন্ধানে হাতে আসা ডকুমেন্ট অনুযায়ী, ৬ মে রাতে জেনেভা ক্যাম্প বাজারের সেক্টর ৭-এর জি ব্লকের ওয়াটার পয়েন্ট ইউনিটের রাস্তা থেকে সাদ্দামকে আটক করে পুলিশ। ওই রাতেই থানায় নিয়ে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) তৈরি হয়। সেখানে বলা হয়—

  • আসামি সাদ্দামের কাছ থেকে ১০০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়েছে।
  • মামলা নম্বর: ২৪/৪৪৩
  • আইন ও ধারা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১)/৮(গ)
  • বাদী হিসেবে উল্লেখ: তৎকালীন এসআই মো. শাখাওয়াত হোসেন
  • নিয়ন্ত্রণ নম্বর, বিপি ফরম নম্বর ও বাংলাদেশ ফরম নম্বর যথাযথভাবে লেখা।
  • জিডি রেজিস্ট্রারেও তথ্য পাওয়া যায়—
  • জিডি নম্বর: ৫০০
  • সময়: ৭ মে রাত ১২টা ৪০ মিনিট
  • ফরম নম্বর: বিপি ফরম নং ৬৫, বাংলাদেশ ফরম নং ৫৩৬৫
  • পৃষ্ঠার নম্বর: ৯২৫৩২৮
আসামি চালানোর জন্য একটি জিডি করা হয় জন্য ৫০০ নাম্বার জিডি ও পরবর্তীতে ২৪ সালের একটি ওয়ারেন্টে চালান করা হয়।
  • একইভাবে আসামি চালান কপিতে সাদ্দামের নাম ৩ নম্বর সিরিয়ালে লেখা হয়েছে। সেখানে তার নাম, পিতার নাম, মামলা নম্বর, ধারা এবং তদন্ত কর্মকর্তার নাম উল্লেখ আছে।

তবে পরে এই মামলার কোনো ফরওয়ার্ডিং কোর্টে জমা দেওয়া হয়নি। থানার নথি থেকে মাদক মামলার এফআইআর অদৃশ্য হয়ে যায়।

কীভাবে মামলা বদলানো হলো

স্থানীয় সূত্র জানায়, জেনেভা ক্যাম্পে এক মারপিটের ঘটনায় সাদ্দামকে আটক করা হয়। থানায় এনে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে পূর্বের দুইটি মাদক মামলার ওয়ারেন্ট রয়েছে। তখন তার কাছে কোনো হেরোইন ছিল না।”

তবে পরবর্তীতে থানার ওসির নির্দেশে ঘনিষ্ঠ এসআই আলতাফের মাধ্যমে একটি মাদক মামলার এফআইআর ড্রাফট করা হয়। কিন্তু পরে সেই মামলা রহস্যজনকভাবে বাতিল হয়ে যায় এবং সাদ্দামকে পুরোনো ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।”

‎অভিযোগ: থানায় চক্র, টাকা লেনদেন

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার চার উপ-পরিদর্শকে (এসআই) নিয়ে একটি চক্র গড়ে তুলেছে। এ চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে এসআই আলতাফ,মল্লিক, মাহিদুল ও মোশারফ। এরা মোহাম্মদপুর থানায় কে গ্রেপ্তার হবে,কাকে কখন আটক করতে হবে সবকিছু নির্ধারন করে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করে। এছাড়াও, মোহাম্মদপুর এলাকায় থাকা আবাসিক হোটেল,ফুটপাত ও ব্যবসায়ীদের থেকে দৈনিক এবং মাসিক হিসেবে টাকা আদায় করে। কেউ যদি রাত ১১টার পর মোহাম্মদপুরের কোন এলাকায় দোকান খোলা রাখে, তাহলে তার বিনিময়ে তাদের টাকা দিতে হয়। অন্যথায় তাদের আটক করে থানায় নিয়ে আসার মতো ঘটনা ঘটে। তবে, এমন ঘটনাগুলোর পরও মামলা থেকে বাঁচতে ভয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।

ওসি চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে এসআই আলতাফ, মল্লিক, মাহিদুল ও মোশারফ

পুলিশের অভ্যন্তরীণ বক্তব্য

এসআই শাখাওয়াত হোসেন (তৎকালীন বাদী)বলেন: “ঘটনার দিন আমরা তিনজন—আমি, এসআই আলতাফ ও এএসআই সাত্তার—ডিউটিতে ছিলাম। জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে দেখি কয়েকজন সাদ্দামকে আটক করেছে। আমরা থানায় নিয়ে আসি। পরে দেখি তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে। কিন্তু এফআইআরে কেন আমার নাম বাদী হিসেবে দেওয়া হলো, আমি জানি না। আমার বিপি নম্বর, মোবাইল নম্বর সবই থানায় দেওয়া ছিল।”

ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজু আহমেদ বলেন, ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (উপ-পরিদর্শক) এসআই এস আই রাজু আহমেদ বলেন, আমাকে থানার সিসি মুন্সী ফোন দিয়ে জানায় আপনার নামে একটি হিরোইনের মামলা দেওয়া হয়েছে সেটি আপনি তদন্ত করবেন এবং আসামিকে আদালতে প্রেরণ করবেন। পরে আমি ২৪ নম্বর  মামলার জন‍্য একটি ফরওয়ার্ডিং রেডি করে মুন্সির কাছে জমা দিতে চাই। তখন মুন্সির জানায় এই ২৪ নম্বর মামলা হেরোইনের মামলা হবে না এবং আসামিও চালান হবে না। পরে আমি ফরওয়ার্ডিং টা মুন্সির কাছে জমা দিয়ে এবং আসামের তালিকা থেকে নাম কেটে দিয়ে চলে আসি।'

এসআই আরও জানায়, ‘একটা মামলা হলে আমরা আসলে জানতে পারি না ওসি যাকে নির্ধারণ করে দেয় তদন্তকারী কর্মকর্তা তারাই ওই মামলাটি তদন্ত করেন আমি এর পিছনে আগের কোন ঘটনা কিছুই জানিনা আমাকে জানানোর পর আমি জাস্ট ফরওয়ার্ডিং দিয়েছি এর বেশি আমি কোন কিছুই জানিনা।

জেনেভা ক্যাম্প থেকে গ্রেপ্তার সাদ্দাম ওরফে ম্যানেজার সাদ্দাম এর ছবি।

এই বিষয়ে সিসি মুন্সী সাজেদুর জানান, “প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল এটি মাদক মামলা হবে। পরে হঠাৎ জানানো হয় এটি আর মাদক মামলা হবে না। আপনাকে অচি নিষেধ করেছিল নাকি অন্য কেউ এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক আগের ঘটনা কে নিষেধ করেছিল মনে নেই।”

অভিযানে থাকা এসআই আলতাফ বলেন, আমরা খবর পেয়ে শুধু তাকে জেনেভা ক্যাম্প থেকে ধরে নিয়ে এসেছি তার কাছে আমরা কোন হেরোইন পাইনি। আমরা তাকে নিয়ে আসি তখন আমরা তার কাছে কোন মাদক পাইনি।

আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে আপনারা ১০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করে মামলার ড্রাফট সাজানো, জিডি, চালান,কপি এগুলো আপনার নির্দেশে হয়েছে এবং এই মামলা প্রত্যাহারের জন্য ১০ লাখ টাকা আপনি এখান থেকে নিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনি যেগুলো বলছেন সেগুলো সব কিছুই মিথ্যা। আমরা তার কাছে তো হেরোইনি পাইনি তাহলে আমরা তাকে কিভাবে মামলা দিব। আর আমি তো এই মামলা নেওয়া না নেওয়ার কোন নির্দেশদাতা নই। এসব নির্দেশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে আসে। এজাহার নাই কিন্তু এফ আই আর চালান কপি সবকিছু হয়ে গেছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,এগুলো নিয়ে আমাদের একটি বিভাগীয় তদন্ত হচ্ছে। তবে যে সব ঘটনার কথা আপনারা বলছেন এই সব ঘটনার সাথে আমরা জড়িত নই।''

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার বলেন, থানায় ওইদিন অনেক আসামি ছিলো। ভুলবশত ডিউটি অফিসার একজনকে নিয়ে চালান কপিও লিখে ফেলছে। এটা সে স্বীকার করছে। পরে সে একটি আলাদাভাবে জিডিতে নোট দেয়। এটা নিয়ে বিভাগীয় একটা তদন্ত চলতেছে। ইতোমধ্যে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমি অলরেডি তদন্ত কমিটি সম্মুখে ইন্টারভিউ দিয়েছি।এর মধ্যে কারা যেন সুযোগ নিয়ে একটা এফআইআর কপি বানিয়ে সেটা দিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় থানার লোকজন জড়িত না থাকলে কিভাবে এতো গোপনীয় কাগজপত্র বাহিরে যায়। থানার কেউ জড়িত না থাকলে এসব কাগজ বাইরে যাওয়ার কথা না। অবশ্যই তারা কেউ আমাদের খারাপ চায়।’

এ ঘটনায় ডিএমপি তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা জানান, এ বিষয়ে আমরা এতোদিন অবগত ছিলাম না। এখন আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি আমরা জানতে পারলাম। এ বিষয়ে আমরা অধিকতর তদন্ত করে যারা এই ঘটনায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দেয়া হবে।’

এদিকে ওসি সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ এরকম কিছু বিষয়ে আমরা শুনতে পেরেছি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমরা বিষয়গুলো আমলে নিয়েছি।। যদি ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।’

‎ঘটনার বিষয়টি শুনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপস) এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, যদি এমন কোন ঘটনা কেউ ঘটিয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এসসি//

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Sponsored Ads
KINIVALO

গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ

সাম্প্রতিক মন্তব্য